“আয়কর রিটার্ন” কথাটা শুনলেই অনেকের মনে প্রশ্ন আসে: এটা কি আমার জন্য? কত ট্যাক্স দিতে হবে? ভুল হলে কি জরিমানা হবে? এই গাইডে রয়েছে NBR-এর সর্বশেষ পরিপত্র (০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) অনুযায়ী সঠিক তথ্য। পুরোটা পড়লে আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
বাংলাদেশে “করবর্ষ” ও “আয়বর্ষ” আলাদা। কোন বছরের হার প্রযোজ্য সেটা নির্ভর করে আপনি কখন উপার্জন করেছেন তার উপর।
- সাধারণ পুরুষ করদাতার বার্ষিক আয় ৪,০০,০০০ টাকার বেশি হলে রিটার্ন বাধ্যতামূলক (আয়বর্ষ ২০২৫-২৬, করবর্ষ ২০২৬-২৭)।
- মহিলা করদাতা ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতার ক্ষেত্রে সীমা ৪,৫০,০০০ টাকা।
- তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষেত্রে সীমা ৫,২৫,০০০ টাকা।
- গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধার ক্ষেত্রে সীমা ৫,৫০,০০০ টাকা।
- e-TIN নম্বর থাকলে আয় যত কমই হোক, রিটার্ন দিতেই হবে।
আয়কর রিটার্ন কী? (সহজ ব্যাখ্যা)
আয়কর রিটার্ন হল একটি নির্দিষ্ট ফর্ম, যেখানে আপনি সরকারকে জানান: গত আয়বর্ষে আপনার মোট আয় কত ছিল, কত ট্যাক্স দিয়েছেন, এবং কোনো রিবেট বা ছাড় পাওয়ার যোগ্য কিনা। এটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এ জমা দিতে হয়।
সহজ কথায়: আপনি কত উপার্জন করেছেন এবং তার উপর কত ট্যাক্স দেওয়া উচিত, সেই হিসাব সরকারকে জানানোই রিটার্ন দাখিল। আয়কর ও ভ্যাটের পার্থক্য সম্পর্কে জানতে আমাদের আয়কর বনাম VAT গাইডটি পড়ুন।
কে আয়কর রিটার্ন দিতে বাধ্য?
আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ২৬৪ ও NBR আয়কর পরিপত্র ২০২৬-২০২৭ অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। নিচের যেকোনো একটি শর্ত পূরণ হলে রিটার্ন দিতে হবে:
| করদাতার ধরন | করমুক্ত সীমা (আয়বর্ষ ২০২৫-২৬) | রিটার্ন বাধ্যতামূলক? |
|---|---|---|
| সাধারণ পুরুষ করদাতা | ৪,০০,০০০ টাকার বেশি | ✅ হ্যাঁ |
| মহিলা করদাতা ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব | ৪,৫০,০০০ টাকার বেশি | ✅ হ্যাঁ |
| তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি | ৫,২৫,০০০ টাকার বেশি | ✅ হ্যাঁ |
| গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধা | ৫,৫০,০০০ টাকার বেশি | ✅ হ্যাঁ |
| e-TIN নম্বরধারী যেকোনো ব্যক্তি | আয় যাই হোক | ✅ অবশ্যই (আয় শূন্য হলেও) |
আয়কর স্ল্যাব: উভয় আয়বর্ষের সঠিক হার
NBR আয়কর পরিপত্র ২০২৬-২০২৭ ও পূর্ববর্তী পরিপত্র অনুযায়ী দুটি আয়বর্ষের হার ভিন্ন। নিচে উভয়ই দেওয়া হলো। আপনি কখন উপার্জন করেছেন সেই বছরের কলামটি দেখুন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ বাজেটে ট্যাক্সে কী পরিবর্তন এলো তা আরও বিস্তারিত জানতে আমাদের বাজেট বিশ্লেষণ আর্টিকেলটি পড়তে পারেন।
| মোট আয়ের স্তর | হার |
|---|---|
| প্রথম ৩,৫০,০০০ টাকা | ০% |
| পরবর্তী ১,০০,০০০ টাকা | ৫% |
| পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা | ১০% |
| পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা | ১৫% |
| পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা | ২০% |
| পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা | ২৫% |
| অবশিষ্ট মোট আয় | ৩০% |
| মোট আয়ের স্তর | হার |
|---|---|
| প্রথম ৪,০০,০০০ টাকা | ০% |
| ⚠️ ৫% স্তর নেই, সরাসরি ১০% থেকে শুরু | |
| পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা | ১০% |
| পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা | ১৫% |
| পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা | ২০% |
| পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা | ২৫% |
| অবশিষ্ট মোট আয় | ৩০% |
বিশেষ করমুক্ত সীমা: আয়বর্ষ ২০২৫-২৬ (করবর্ষ ২০২৬-২৭)
| করদাতার ধরন | করমুক্ত সীমা |
|---|---|
| মহিলা করদাতা ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব | ৪,৫০,০০০ টাকা |
| তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি | ৫,২৫,০০০ টাকা |
| গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান আহত “জুলাই যোদ্ধা” | ৫,৫০,০০০ টাকা |
ন্যূনতম কর, অনেকেই জানেন না
আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, করমুক্ত সীমার উপরে আয় থাকলে হিসাব করা করের পরিমাণ শূন্য বা ঋণাত্মক হলেও একটি ন্যূনতম কর দিতে হয়।
ধরুন, ঢাকায় চাকরি করেন এবং আপনার বার্ষিক বেতন ৬,০০,০০০ টাকা (৬ লাখ)।
→ প্রথম ৪,০০,০০০ টাকা করমুক্ত = ০ টাকা
→ পরবর্তী ২,০০,০০০ টাকায় ১০% = ২০,০০০ টাকা
মোট হিসাব করা কর: ২০,০০০ টাকা
📌 বিনিয়োগ রিবেট বাদ দিলে আরও কমতে পারে। কিন্তু ন্যূনতম ৫,০০০ টাকা দিতেই হবে।
🖥️ e-Return পোর্টালে যান etaxnbr.gov.bd →
রিটার্ন দাখিলের জন্য কোন কাগজপত্র লাগবে?
রিটার্ন দাখিলের আগে নিচের কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন। সম্পূর্ণ চেকলিস্টের জন্য আমাদের আয়কর রিটার্নের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সম্পূর্ণ তালিকা দেখুন।
- e-TIN সনদ: না থাকলে আগে নিবন্ধন করুন
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
- বেতন সনদ বা TDS সনদ: নিয়োগকর্তার দেওয়া আয়কর সনদ
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট: সঞ্চয়ী হিসাবের সর্বশেষ ব্যালেন্স
- বিনিয়োগের প্রমাণ: সঞ্চয়পত্র, FDR, জীবন বীমার প্রিমিয়াম রসিদ (রিবেটের জন্য)
- সম্পদের তথ্য: গাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট থাকলে কাগজপত্র
- পূর্ববর্তী বছরের রিটার্নের Acknowledgement Slip (থাকলে)
ধাপে ধাপে e-Return দাখিলের নিয়ম
-
১e-TIN নিবন্ধন করুন (না থাকলে)
etaxnbr.gov.bd-এ যান, “নতুন নিবন্ধন” বাটনে ক্লিক করুন। NID নম্বর দিয়ে যাচাই করুন। ১২ সংখ্যার TIN তাৎক্ষণিক পাবেন। কোনো অফিসে যেতে হয় না। বিস্তারিত প্রক্রিয়া জানতে পড়ুন: e-TIN নিবন্ধন সম্পূর্ণ গাইড।
-
২e-Return পোর্টালে লগইন করুন
TIN নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে etaxnbr.gov.bd-এ লগইন করুন। নতুন হলে মোবাইল OTP দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন।
-
৩সঠিক আয়বর্ষ নির্বাচন করুন
পোর্টালে কোন আয়বর্ষের রিটার্ন জিজ্ঞেস করবে। নভেম্বর ২০২৬-এ দিলে আয়বর্ষ ২০২৫-২৬ নির্বাচন করুন। সঠিক বর্ষ না দিলে ভুল হারে কর হিসাব হবে।
-
৪আয় ও বিনিয়োগের তথ্য পূরণ করুন
বেতন, ব্যবসায়িক আয়, বাড়িভাড়ার আয়, সঞ্চয়পত্রের সুদ সব আলাদাভাবে দেখান। সঞ্চয়পত্র, জীবন বীমার প্রিমিয়াম ইত্যাদির তথ্য দিয়ে রিবেট দাবি করুন। কর রিবেট সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন: কর রিবেট ও বিনিয়োগ ভাতা গাইড।
-
৫কর পরিশোধ ও সাবমিট করুন
নেট করের পরিমাণ দেখাবে। iBAS++ পোর্টাল বা ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে পরিশোধ করুন। পেমেন্ট রেফারেন্স নম্বর দিন এবং সাবমিট করুন। Acknowledgement Slip ডাউনলোড করে রাখুন।
সাধারণ ভুল এবং কীভাবে এড়াবেন
- ভুল ১: পুরনো ৭ স্তরের হিসাব ব্যবহার করা। বর্তমান আয়বর্ষে (২০২৫-২৬) ৫% স্তর নেই, মোট ৬টি স্তর।
- ভুল ২: দুই বছরের হার গুলিয়ে ফেলা। আয়বর্ষ ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬-এর হার আলাদা।
- ভুল ৩: বিনিয়োগ রিবেট ভুলে যাওয়া। সঞ্চয়পত্র, FDR, জীবন বীমায় বিনিয়োগের উপর রিবেট পাওয়া যায়।
- ভুল ৪: ন্যূনতম কর না দেওয়া। করমুক্ত সীমার উপরে আয় থাকলে হিসাব করা কর শূন্য হলেও ন্যূনতম কর দিতে হবে।
- ভুল ৫: Acknowledgement Slip না রাখা। এই রসিদ ব্যাংক লোন, PSR, ক্রেডিট কার্ড সহ ৩৯টি সেবায় প্রয়োজন।
- ভুল ৬: শূন্য রিটার্ন না দেওয়া। আয় না থাকলেও TIN থাকলে রিটার্ন দিতে হবে।
e-Return বনাম ম্যানুয়াল রিটার্ন
| বিষয় | e-Return (অনলাইন) | ম্যানুয়াল (অফিসে) |
|---|---|---|
| সময় | ১ থেকে ২ ঘণ্টা, ঘরে বসে | অফিসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন |
| সুবিধা | তাৎক্ষণিক রসিদ, স্বয়ংক্রিয় হিসাব | ব্যক্তিগত সহায়তা পাওয়া যায় |
| পরামর্শ | প্রথম পছন্দ | জটিল কেসে বিবেচনা করুন |
- শুধু বেতন থেকে আয়
- কোনো ব্যবসা বা অংশীদারিত্ব নেই
- কোনো বিদেশী আয় নেই
- সম্পদের পরিমাণ সরল ও স্পষ্ট
- আগে কখনো ট্যাক্স সমস্যা হয়নি
- একাধিক উৎস থেকে আয় (ব্যবসা এবং বেতন)
- ফ্রিল্যান্সিং বা বিদেশী রেমিট্যান্স আছে
- ট্যাক্স অডিট নোটিশ পেয়েছেন
- জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি করেছেন এই বছর
- মূলধনী আয় বা শেয়ার হস্তান্তর হয়েছে
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
সারসংক্ষেপ
আয়কর রিটার্ন দাখিল ভয়ের কিছু নয়। মনে রাখুন: আয়বর্ষ ২০২৪-২৫-এর করমুক্ত সীমা ছিল ৩,৫০,০০০ টাকা, ৭টি স্তরে সর্বোচ্চ ৩০% পর্যন্ত কর প্রযোজ্য ছিল। আয়বর্ষ ২০২৫-২৬ থেকে (বর্তমান) করমুক্ত সীমা বেড়ে ৪,০০,০০০ টাকা হয়েছে এবং ৫% স্তর বাদ গেছে। উভয় বছরে রিটার্নের শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর। অনলাইনে etaxnbr.gov.bd-এ ঘরে বসেই রিটার্ন দেওয়া যায়।
পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের এই গাইডগুলো পড়ুন: e-TIN নিবন্ধন গাইড, TDS কর্তন ও সমন্বয়, এবং PSR প্রত্যয়নপত্র গাইড। আরও জানতে NBR-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।
এই নিবন্ধের সব তথ্য NBR-এর আয়কর পরিপত্র ২০২৬-২০২৭ (জারি: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নথি নং ০৮.০১.০০০০.০০০.০৩০.০৩.০২৯.২৬.১১২) এবং পূর্ববর্তী আয়কর পরিপত্র ২০২৫-২৬ (জারি: ২১ আগস্ট ২০২৫, নথি নং ০৮.০১.০০০০.০০০.০৩১.০৮.০০০১.২৫.৮৪) থেকে সরাসরি যাচাই করা হয়েছে।
মূল সূত্র: আয়কর পরিপত্র ২০২৬-২০২৭ | জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ | আয়কর আইন ২০২৩ | নথি নং: ০৮.০১.০০০০.০০০.০৩০.০৩.০২৯.২৬.১১২, তারিখ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (পূর্ববর্তী পরিপত্র ২০২৫-২৬, নথি নং ০৮.০১.০০০০.০০০.০৩১.০৮.০০০১.২৫.৮৪, তারিখ ২১ আগস্ট ২০২৫)



[…] আরও পড়ুন: প্রথমবার রিটার্ন দাখিলের গাইড দেখুন কোন করবর্ষের হার আপনার জন্য […]