“আয়কর” শব্দটা শুনলেই অনেকের মাথায় জটিলতার ছবি ভাসে। কিন্তু মূল ব্যাপারটা আসলে সহজ: রাষ্ট্র প্রতি বছর আপনার আয়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ নেয়, সেটাই আয়কর। এই গাইডে জানবেন, আয়কর আসলে কী, কাকে দিতে হয়, কতটুকু দিতে হয় এবং আপনার নিজের ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।
আয়কর হলো বার্ষিক আয়ের উপর সরকারকে প্রদেয় কর, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) নির্ধারিত হারে আদায় করে। বাংলাদেশে আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী প্রতিটি করবছর (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন) শেষে নির্ধারিত তারিখের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে হয়।
আয়কর কী: সহজ ভাষায়
ধরুন আপনি এক বছরে ৮ লাখ টাকা উপার্জন করলেন। সরকার বলছে, এই আয়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ দেশের উন্নয়নে জমা দিন। সেই অংশটাই আয়কর।
কত টাকা দিতে হবে সেটা নির্ভর করে আপনার মোট আয়ের উপর। বাংলাদেশে আয়কর “স্ল্যাব” পদ্ধতিতে কাজ করে: আয় যত বেশি, হার তত বেশি।
আয়কর আইন ২০২৩ এবং এর সর্বশেষ সংশোধন অনুযায়ী ২০২৫-২০২৬ করবর্ষে নতুন হার কার্যকর হয়েছে।
২০২৫-২০২৬ করবর্ষে আয়কর স্ল্যাব ও হার
নিচের ছকটি NBR-এর আয়কর পরিপত্র ২০২৫-২০২৬ অনুযায়ী তৈরি। এটি সাধারণ পুরুষ করদাতার জন্য প্রযোজ্য:
| মোট আয় | করহার | উদাহরণ (৮ লাখ আয়ে কর) |
|---|---|---|
| প্রথম ৩,৭৫,০০০ টাকা পর্যন্ত | শূন্য (করমুক্ত) | ০ টাকা |
| পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত | ১০% | আংশিক: ১৮,৭৫০ টাকা |
| পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত | ১৫% | বাকি ১,২৫,০০০-এ: ১৮,৭৫০ টাকা |
| পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত | ২০% | প্রযোজ্য নয় |
| পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত | ২৫% | প্রযোজ্য নয় |
| অবশিষ্ট সমস্ত আয় | ৩০% | সর্বোচ্চ হার |
বিভিন্ন শ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা
সবার জন্য একই নিয়ম নয়। NBR বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্য বাড়তি সুবিধা দেয়:
কে আয়কর দিতে আইনত বাধ্য?
নিচের যেকোনো একটি শর্ত পূরণ হলে আয়কর দিতে হবে, অথবা কমপক্ষে রিটার্ন দাখিল করতে হবে:
ন্যূনতম কর: শূন্য কর কোনো বিকল্প নয়
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: করমুক্ত সীমার উপরে আয় থাকলে, বিনিয়োগ ছাড়ের পরে কর শূন্য বা ঋণাত্মক হলেও, ন্যূনতম কর দিতে হবে।
| করদাতার অবস্থান | ন্যূনতম কর (২০২৫-২৬) |
|---|---|
| ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকা | ৫,০০০ টাকা |
| অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকা | ৪,০০০ টাকা |
| সিটি কর্পোরেশনের বাইরে অন্যান্য এলাকা | ৩,০০০ টাকা |
| নতুন করদাতা (প্রথমবার রিটার্ন দিচ্ছেন) | ১,০০০ টাকা |
কোম্পানির আয়কর হার কত?
ব্যক্তির মতো কোম্পানির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট হার রয়েছে। প্রধান হারগুলো:
| কোম্পানির ধরন | করহার (২০২৫-২৬) |
|---|---|
| পাবলিক লিস্টেড কোম্পানি (IPO-র মাধ্যমে ১০%+ শেয়ার হস্তান্তর) | ২২.৫% |
| অন্যান্য পাবলিক লিস্টেড কোম্পানি | ২৫% |
| পাবলিক লিস্টেড নয় এমন কোম্পানি | ২৭.৫% |
| পাবলিক লিস্টেড ব্যাংক, বীমা ও ফাইন্যান্স কোম্পানি | ৩৭.৫% |
| সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী | ৪৫% |
- শুধু বেতন থেকে আয়
- TDS ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে
- কোনো ব্যবসায়িক আয় নেই
- বিদেশি আয় বা সম্পদ নেই
- একাধিক উৎস থেকে আয়
- ব্যবসা বা ফ্রিল্যান্সিং আয়
- বাড়িভাড়া বা সম্পদ বিক্রির আয়
- বড় বিনিয়োগ বা কর রিবেটের প্রশ্ন
সচরাচর জিজ্ঞাসা
হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রে আয় কম হলেও রিটার্ন দাখিল করতে হয়। ব্যাংক ঋণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং গাড়ি রেজিস্ট্রেশনে রিটার্নের প্রমাণ (PSR) লাগে। আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ২৬৪ অনুযায়ী ৩৯টি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে PSR বাধ্যতামূলক।
সাধারণ ব্যক্তি করদাতার জন্য প্রতি বছরের ৩০ নভেম্বর রিটার্ন দাখিলের নির্ধারিত তারিখ। সেই তারিখ সরকারি ছুটির দিন হলে পরবর্তী কর্মদিবস। কোম্পানির সময়সীমা আলাদা।
না। রিটার্ন দাখিলের জন্য প্রথমে ই-TIN নিবন্ধন করতে হবে। এটি etaxnbr.gov.bd থেকে বিনামূল্যে করা যায়। বিস্তারিত দেখুন: e-TIN নিবন্ধন কীভাবে করবেন।
বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা রেমিট্যান্স বর্তমানে কিছু শর্তে করমুক্ত সুবিধা পায়। দেশীয় ক্লায়েন্ট থেকে আয় নিয়মিত আয়করের আওতায় পড়ে। বিস্তারিত দেখুন: ফ্রিল্যান্সারদের আয়কর গাইড।
নেট সম্পদ ৪ কোটি টাকার বেশি হলে সারচার্জ প্রযোজ্য। ৪ থেকে ১০ কোটিতে ১০%, ১০ থেকে ২০ কোটিতে ২০%, ২০ থেকে ৫০ কোটিতে ৩০% এবং ৫০ কোটির বেশি হলে ৩৫% হারে সারচার্জ দিতে হয়।
আয়কর পরিপত্র ২০২৫-২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষেও সাধারণ পুরুষ করদাতার করমুক্ত সীমা ৩,৭৫,০০০ টাকা থাকবে। মহিলা ও ৬৫+ বয়স্কদের জন্য ৪,২৫,০০০ টাকা।
আয়কর জটিল নয়: সঠিক তথ্য জানলেই নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এই নিবন্ধটি NBR-এর আয়কর পরিপত্র ২০২৫-২০২৬ অনুযায়ী আপডেট করা হয়েছে। আরও তথ্যের জন্য nbr.gov.bd এবং etaxnbr.gov.bd দেখুন।

