ব্যাংক ঋণ, ট্রেড লাইসেন্স, গাড়ি কেনা, নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়া, এমনকি জমি রেজিস্ট্রি করতে গেলেও প্রথম প্রশ্নটাই আসে: “আপনার TIN আছে?” সুখবর হলো, e-TIN নিবন্ধন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং ঘরে বসে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটে শেষ করা যায়। এই গাইডে ধাপে ধাপে পুরো প্রক্রিয়া দেখানো হয়েছে।
- করমুক্ত সীমার বেশি আয় হলে, বা আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজন হলে।
- ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা বা মালিকানায় থাকলে।
- জমি, ফ্ল্যাট বা অন্য কোনো স্থাবর সম্পত্তি কেনার পরিকল্পনা থাকলে।
- ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষকের মতো লাইসেন্সধারী পেশায় থাকলে।
- ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন (IRC/ERC) বা সরকারি টেন্ডারে অংশ নিতে চাইলে।
- কোম্পানির পরিচালক হলে, নিজের ব্যক্তিগত TIN আলাদাভাবে লাগবে।
e-TIN কী এবং কেন দরকার?
e-TIN (Electronic Taxpayer Identification Number) হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক ইস্যুকৃত ১২ সংখ্যার একটি অনন্য পরিচিতি নম্বর, যা বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় আপনার স্থায়ী পরিচয় হিসেবে কাজ করে। ২০১৩ সাল থেকে পুরো নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল, কোনো অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
একবার TIN পেলে তা সারাজীবনের জন্য বৈধ, নবায়নের প্রয়োজন নেই। প্রথমবার রিটার্ন দাখিল করতে চাইলে TIN-ই প্রথম ধাপ। বিস্তারিত জানতে পড়ুন: প্রথমবার আয়কর রিটার্ন দাখিলের সম্পূর্ণ গাইড।
কোন কোন ক্ষেত্রে TIN বাধ্যতামূলক?
আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী নিচের যেকোনো একটি পরিস্থিতিতে TIN নিবন্ধন প্রয়োজন হয়:
| শ্রেণি | উদাহরণ |
|---|---|
| ব্যক্তিগত করদাতা | করমুক্ত সীমার বেশি আয়, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার |
| সম্পদের মালিক | ব্যক্তিগত গাড়ি, জমি বা ফ্ল্যাট ক্রেতা |
| লাইসেন্সধারী পেশাজীবী | ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক, পরামর্শক |
| ব্যবসা প্রতিষ্ঠান | ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন (IRC/ERC), VAT (e-BIN) নিবন্ধনকারী |
| কোম্পানি ও পরিচালক | প্রতিটি লিমিটেড কোম্পানি এবং প্রতিটি পরিচালকের পৃথক TIN প্রয়োজন |
| অন্যান্য | সরকারি টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী, নির্বাচনে প্রার্থী, নির্দিষ্ট সীমার বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রেতা |
নিবন্ধনের আগে কী কী প্রস্তুত রাখবেন
শুরু করার আগে নিচের তথ্য ও কাগজ হাতের কাছে রাখুন, তাহলে পুরো প্রক্রিয়া বাধাহীনভাবে শেষ হবে।
ব্যক্তিগত করদাতার জন্য
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): স্মার্ট NID থাকলে ১৭ সংখ্যার নম্বর ব্যবহার করুন
- জন্মতারিখ: NID-তে যেভাবে লেখা ঠিক সেভাবেই দিতে হবে
- বাবা ও মায়ের নাম: NID অনুযায়ী
- সচল মোবাইল নম্বর: NID-এর সাথে লিংক করা থাকতে হবে, OTP এই নম্বরেই আসবে
- সচল ইমেইল ঠিকানা
- বর্তমান ঠিকানা
বিদেশি নাগরিকের জন্য
- বৈধ পাসপোর্ট নম্বর, ইস্যু ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখসহ
- বাংলাদেশে বসবাসের ঠিকানা
- OTP গ্রহণের জন্য সচল মোবাইল নম্বর
কোম্পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য
- RJSC থেকে প্রাপ্ত কোম্পানি নিবন্ধন সনদ (Certificate of Incorporation)
- কোম্পানির নাম ও নিবন্ধিত ঠিকানা
- অনুমোদিত প্রতিনিধির (সাধারণত পরিচালক) NID ও মোবাইল নম্বর
- ট্রেড লাইসেন্স নম্বর (থাকলে)
ধাপে ধাপে e-TIN নিবন্ধন প্রক্রিয়া
-
১NBR পোর্টালে যান
secure.incometax.gov.bd/TINHome এ যান। এটিই e-TIN নিবন্ধনের একমাত্র অফিসিয়াল সরকারি পোর্টাল। ফি নেয় এমন কোনো তৃতীয় পক্ষের সাইট এড়িয়ে চলুন, পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
-
২“Register” বাটনে ক্লিক করুন
হোমপেজে Register বাটনে ক্লিক করলে অ্যাকাউন্ট তৈরির পেজে যাবেন।
-
৩মৌলিক তথ্য দিন ও মোবাইল OTP যাচাই করুন
করদাতার ধরন (ব্যক্তি বা কোম্পানি) নির্বাচন করুন, NID নম্বর, জন্মতারিখ, মোবাইল ও ইমেইল দিন এবং একটি ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড তৈরি করুন। সাবমিট করার পর মোবাইলে একটি OTP আসবে, সেটি দিয়ে অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করুন।
-
৪লগইন করে সম্পূর্ণ আবেদন ফর্ম পূরণ করুন
নতুন ইউজার আইডি দিয়ে লগইন করুন। “TIN Application” এ ক্লিক করে নাম, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা, আয়ের উৎস ইত্যাদি সম্পূর্ণ তথ্য দিন। সিস্টেম আপনার ঠিকানার ভিত্তিতে কর অঞ্চল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করবে, সেটি যাচাই করে নিন।
-
৫পর্যালোচনা করে সাবমিট করুন
সাবমিট করার আগে প্রতিটি তথ্য ভালোভাবে যাচাই করুন। নামের বানান, জন্মতারিখ বা যোগাযোগের তথ্যে ভুল থাকলে পরে রিটার্ন দাখিল ও TDS যাচাইয়ে সমস্যা হতে পারে। সাবমিটের পর পরিবর্তন করতে হলে কর অঞ্চলে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে।
-
৬সার্টিফিকেট ডাউনলোড করুন
সফলভাবে সাবমিট হওয়ার পর সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে ১২ সংখ্যার TIN নিশ্চিত হয় এবং সার্টিফিকেট তাৎক্ষণিকভাবে PDF ফরম্যাটে ডাউনলোডযোগ্য হয়। সাথে সাথেই ডাউনলোড করে রাখুন এবং ইউজার আইডি-পাসওয়ার্ড নিরাপদে সংরক্ষণ করুন।
এই দুটি আলাদা সিস্টেম। TIN নিবন্ধনের ইউজার আইডি-পাসওয়ার্ড দিয়ে secure.incometax.gov.bd এ প্রোফাইল ব্যবস্থাপনা করা যায়।
বার্ষিক রিটার্ন দাখিলের জন্য আলাদাভাবে etaxnbr.gov.bd পোর্টালে লগইন করতে হয়।
কোম্পানি বা ব্যবসার জন্য TIN নিবন্ধন
কর্পোরেট TIN নিবন্ধন একইরকম অনলাইন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, তবে কিছু বাড়তি শর্ত আছে:
- RJSC থেকে নিবন্ধন সনদ পাওয়ার পরই কোম্পানির e-TIN নিবন্ধন সম্পন্ন করা যায়।
- অনুমোদিত প্রতিনিধি (সাধারণত পরিচালক) কোম্পানির তথ্য ও নিজের NID দিয়ে ফর্ম পূরণ করেন।
- কোম্পানি একটি পৃথক আইনি সত্তা হিসেবে নিজস্ব TIN পায়, যা পরিচালকদের ব্যক্তিগত TIN থেকে আলাদা।
- প্রতিটি পরিচালককেও নিজস্ব ব্যক্তিগত TIN বজায় রাখতে হয়।
সাধারণ ভুল এবং কীভাবে এড়াবেন
- ভুল ১: NID-এর সাথে লিংকবিহীন মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা। ফলে OTP আসে না।
- ভুল ২: নামের বানানে অসামঞ্জস্য। “Md.” বনাম “Mohammad” এর মতো ছোট পার্থক্যও পরে যাচাইয়ে সমস্যা তৈরি করে।
- ভুল ৩: একাধিকবার নিবন্ধন করা। প্রতিটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শুধু একটি TIN পেতে পারে, একাধিক TIN রাখা আইনত দণ্ডনীয়।
- ভুল ৪: ভুল করদাতা শ্রেণি নির্বাচন করা। ব্যক্তির জন্য “Company” বা এর উল্টো নির্বাচন করলে সংশোধনের জন্য কর অঞ্চলে আনুষ্ঠানিক আবেদন লাগে।
- ভুল ৫: পুরনো ১৩ সংখ্যার NID ব্যবহার করা। স্মার্ট NID থাকলে ১৭ সংখ্যার নম্বর ব্যবহার করুন।
- ভুল ৬: সার্টিফিকেট তাৎক্ষণিকভাবে ডাউনলোড না করা। সেশন শেষ হয়ে গেলে আবার লগইন করে সংগ্রহ করতে হবে।
TIN হারিয়ে গেলে বা পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে কী করবেন
আগে থেকেই TIN থাকলে নতুন করে নিবন্ধন করবেন না, বরং বিদ্যমান অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার করুন।
- পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে: লগইন পেজে “Forgot Password” অপশনে গিয়ে নিবন্ধিত ইমেইল বা মোবাইলে রিসেট লিংক বা OTP নিন।
- সার্টিফিকেট আবার ডাউনলোড করতে চাইলে: অ্যাকাউন্টে লগইন করে প্রোফাইল থেকে সরাসরি ডাউনলোড করুন। এটিও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
- TIN নম্বরও মনে না থাকলে: NID নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল অফিসে যোগাযোগ করুন।
- বাংলাদেশি নাগরিক, বৈধ ও সচল NID আছে
- NID-লিংকড মোবাইল নম্বর ব্যবহারযোগ্য
- শুধু ব্যক্তিগত TIN দরকার
- তথ্য সহজ ও স্পষ্ট (নাম, ঠিকানা মিলে যায়)
- প্রবাসী বাংলাদেশি, NID-লিংকড মোবাইল সচল নয়
- বিদেশি নাগরিক হিসেবে পাসপোর্টে নিবন্ধন করছেন
- কোম্পানি নিবন্ধন RJSC তথ্যের সাথে মিলছে না
- নাম বা জন্মতারিখে NID-তে ভুল আছে বলে মনে হচ্ছে
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
সারসংক্ষেপ
e-TIN নিবন্ধন বাংলাদেশের সবচেয়ে সহজ সরকারি ডিজিটাল সেবাগুলোর একটি, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং ঘরে বসেই সম্পন্ন করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো NID-লিংকড সচল মোবাইল নম্বর নিশ্চিত করা এবং সব তথ্য NID অনুযায়ী নির্ভুলভাবে দেওয়া। একবার TIN পেলে তা সারাজীবনের জন্য বৈধ থাকে।
এরপর কী করবেন তা জানতে পড়ুন: প্রথমবার আয়কর রিটার্ন দাখিলের গাইড। কোনো ধাপে আটকে গেলে বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।
মূল সূত্র: NBR e-TIN রেজিস্ট্রেশন পোর্টাল | আয়কর আইন ২০২৩




[…] etaxnbr.gov.bd-এ যান, “নতুন নিবন্ধন” বাটনে ক্লিক করুন। NID নম্বর দিয়ে যাচাই করুন। ১২ সংখ্যার TIN তাৎক্ষণিক পাবেন। কোনো অফিসে যেতে হয় না। বিস্তারিত প্রক্রিয়া জানতে পড়ুন: e-TIN নিবন্ধন সম্পূর্ণ গাইড। […]
[…] নিচের নির্দিষ্ট বিভাগ দেখুন। 🪪 TIN না থাকলে আগে নিবন্ধন করুন → আয়কর রিটার্নের জন্য প্রয়োজনীয় […]